বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

হ্যাপি পিল

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬
হ্যাপি পিল
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

দীপ্র ভট্টাচার্য 

 

বর্ষার শেষে পাহাড়ি জঙ্গলগুলোর একটা আলাদা গন্ধ হয়। সেই গন্ধে কাঁচা মাটি থাকে, ভেজা পাতা থাকে, আর থাকে বহুদিন না বলা কিছু কথার দুঃখ। আমি প্রথম “হ্যাপি পিল” কথাটা শুনেছিলাম এমনই এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে, এক পুরোনো বনবাংলোয় বাংলোটার নাম এখন আর মনে নেই। হয়তো মনে রাখতে চাইও না। কিছু জায়গার নাম ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে স্মৃতির ভেতরে তারা আরও কুয়াশার মতো সুন্দর হয়ে থাকে।

জঙ্গলে যেতে আমার ভালো লাগে চিরকালই।মানুষের থেকে দূরে। কলকাতার থেকে দূরে।
ফোন, সম্পর্ক, মিটিং, ডেডলাইন, কনফারেন্স কল—সবকিছু থেকে দূরে। কারণ শহর মানুষকে খুব ক্লান্ত করে দেয়। শুধু শরীর না, আত্মাকেও।

সেদিন বিকেলে বৃষ্টি হচ্ছিল টুপটাপ। বাংলোর সামনে একটা পুরোনো সেগুন গাছ। তার গায়ে জলের রেখা নেমে আসছিল, যেন কোনো বুড়ি চুপচাপ কাঁদছে।

আমি বাংলোটার কমন বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই ভদ্রলোক এলেন। পাশের রুমে এসেছেন। খুব সাধারণ চেহারা। আমার মতোই। খাকি রঙের জ্যাকেট, সাদা দাড়ি, চোখে অদ্ভুত শান্তি।
দেখে মনে হয়, তিনি যেন অনেকদিন ধরেই কারও জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
বাংলোর চৌকিদার বলল,
—“সাহেব, উনি সিধু ডাক্তার। একটু অন্য রকম মানুষ। মাঝে মাঝেই আসেন।” এখানে এসে কবিতা লেখেন। 

আর ও চা এলো।  আলাপচারিতা বাড়লো। ডাক্তারবাবুর সাহিত্যে বেশ দখল। চৌকিদারকে রাতে বুনো মুরগির মাংস খাওয়ার কথা বলতে বলতে ডাক্তারবাবু বসে বললেন,
—“আপনি চাকরি করেন? ছুটিও পান। বেশ আনন্দে আছেন। ”
আমি হেসে বললাম,
—“ আনন্দে থাকার চেষ্টা করি।”
তিনি বললেন,
—“তাহলে আপনাকে নিশ্চয়ই হ্যাপি পিল খেতে হয় না।”আমি অবাক হয়ে তাকালাম। বললাম, "সে বস্তুটা আবার কি?"

তিনি পকেট থেকে ছোট্ট একটা টিনের কৌটো বের করলেন।
তার মধ্যে রঙিন ট্যাবলেট।
নীল, হলুদ, হালকা গোলাপি।
বললেন,
—“এগুলো হ্যাপি পিল। খেলে মানুষ কষ্ট ভুলে যায়।”
আমি হেসে বললাম,
—“তা হলে তো পৃথিবীর সব মানুষেরই দরকার।”
তিনি বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 
—“না। সবাই কষ্ট ভুলতে চায় না। কেউ কেউ কষ্টকে পুষে রাখে, যেমন পুরোনো প্রেমিকার চিঠি।”

বৃষ্টি তখন আরও বেড়েছে।
দূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা হরিণ ডাকছিল।
সেই ডাকের মধ্যে এমন একাকীত্ব ছিল, যা শহুরে মানুষ বোঝে না।

ডাক্তারবাবু একটা সিগারেট ধরালেন। বললেন,
—“জানেন, এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যবসা কী?”
আমি বললাম,
—“অস্ত্র?”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
—“না। সুখ।”
আমি চুপ করে রইলাম।
তিনি বললেন,
—“আগে মানুষ দুঃখ নিয়ে বাঁচত। এখন মানুষ দুঃখকে অসভ্যতা মনে করে। সবাই সুখী দেখাতে চায়। তাই হ্যাপি পিল।”

আমি কৌটোটা হাতে নিলাম।
খুব সাধারণ ওষুধের মতো দেখতে। কিন্তু হয়তো এর ভেতরে মানুষ নিজের ভাঙা জীবনটাকে কিছুক্ষণের জন্য মেরামত করে নেয়।
ডাক্তারবাবু বললেন,
—“আপনি বেঁচে গেছেন, এসব খেতে হয় না। কলকাতার বড় বড় অফিসে কাজ করা লোকেরা সকালে ভিটামিনের সঙ্গে এগুলো খায়। রাতে ঘুমের ওষুধ খায়। মাঝখানে সারাদিন হাসে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—“কাজ করে?”
তিনি একটু হেসে বললেন,
—“অভিনয় খুব ভালো হয়।”
তারপর দীর্ঘক্ষণ কেউ কথা বলিনি।

জঙ্গলের বৃষ্টি মানুষের ভেতরের নীরবতাকে আরও গভীর করে দেয়। হঠাৎ ডাক্তারবাবু বললেন,
—“আপনি কি জানেন, পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষ কারা?”
আমি বললাম,
—“কারা?”
—“যারা নিজের দুঃখের কারণটাই ভুলে গেছে।”
এই কথাটা শুনে কেন জানি বুকের মধ্যে হালকা ব্যথা হলো।

মনে এল, আমার এক বন্ধু ছিল। নাম ধরা যাক রাজীব।
বড় চাকরি করত।
দামী গাড়ি, সুন্দর ফ্ল্যাট, বিদেশ ভ্রমণ—সব ছিল।
ফেসবুকে ওর হাসিমুখের ছবি দেখলে মনে হতো, ছেলেটা বুঝি জীবনের সঙ্গে প্রেম করছে।কিন্তু  ফোনে কথা বললে, মনে হত, গলায় অদ্ভুত ক্লান্তি। বলত,
—“জানিস, আমি এখন রোজ সন্ধেবেলা করে একটু দু পাত্তর ওষুধ খাই, ভালো থাকি।"
আমি মজা করে বলতাম,
—“বাহ! সুখ কিনে ফেললি?”
ও চুপ করে থাকত।
তারপর খুব আস্তে বলত,
—“না রে। কষ্টটাকে শুধু সাইলেন্ট মোডে রাখি।”
এই কথাটা আজও আমাকে তাড়া করে।

এখন বুঝছি, আমরা প্রত্যেকেই আজকাল একটু একটু করে হ্যাপি পিল খাই।
কেউ সত্যিকারের ওষুধ।
কেউ সোশ্যাল মিডিয়া।
কেউ মদ।
কেউ কাজ।
কেউ সম্পর্ক।
কেউ ধর্ম।
কেউ এ আই।

হ্যাঁ, এ আই-ও আজকাল এক ধরনের হ্যাপি পিল। রাতে ঘুম না এলে মানুষ এখন আর জানলার বাইরের চাঁদ দেখে না। মোবাইল খুলে এ আই-কে লেখে—
“আমার মন খারাপ।”
ওপাশ থেকে উত্তর আসে—
“আপনি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি মূল্যবান।”
মানুষ সেই কথাগুলো পড়ে একটু হালকা হয়। যদিও জানে, কথাগুলো কোনো হৃদয় থেকে আসেনি। এসেছে সার্ভার থেকে।

তবু মানুষ বিশ্বাস করতে চায়।
কারণ সত্যিকারের মানুষ এখন খুব ব্যস্ত। কারও সময় নেই কারও দুঃখ শোনার।
আগে বন্ধুরা রাত জেগে গল্প করত, শুনত। এখন সবাই বলে— “সরি ভাই, কাল তাড়াতাড়ি উঠতে হবে, সকালে মিটিং আছে।”
তাই মানুষ মেশিনের কাছেও সান্ত্বনা খোঁজে। এ যেন মরুভূমিতে মরীচিকা দেখে জল ভেবে ভুল করা। অন্যমনস্ক হয়ে গেছি দেখে, ওদিকে, ডাক্তারবাবু বললেন,
—“হ্যাপি পিলের আসল কাজ জানেন?”
আমি যথারীতি মাথা নাড়লাম।
তিনি বললেন,
—“এগুলো মানুষকে সুখী করে না। শুধু মানুষকে নিজের শূন্যতাটা কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেয়।”

সন্ধ্যা নেমে এসেছিল তখন।
জঙ্গলের গায়ে কুয়াশা নামছিল ধীরে ধীরে। দূরে কোনো অচেনা পাখি ডাকছিল। ডাক্তারবাবু হঠাৎ বললেন,
—"একটা কথা বলি। যারা খুব গভীরভাবে জীবনকে অনুভব করে, তারা কখনো পুরো সুখী হয় না।”
আমি বললাম,
—“তাহলে?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
—“তারা শুধু সুন্দরভাবে দুঃখী হতে শেখে।”
কী আশ্চর্য কথা!

সত্যিই তো—
সবচেয়ে ভালো গানগুলো সুখ থেকে জন্মায় না। সবচেয়ে ভালো গল্পগুলোও না। কিছু কষ্ট না থাকলে মানুষ গভীর হয় না। হয়তো তাই জঙ্গল এত সুন্দর। কারণ তার মধ্যেও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা আছে।

রাত বাড়ছিল। চৌকিদার এসে লণ্ঠন জ্বেলে দিল। হলুদ আলোয় ডাক্তারবাবুর মুখটা কেমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—“আপনি নিজে হ্যাপি পিল খান?”
তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
—“আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর কিছুদিন খেতাম। তারপর একদিন বুঝলাম, আমি ওকে ভুলে যেতে চাই না। এখন তাই কবিতা লিখি। পড়বেন? "

উঠে গিয়ে ঘর থেকে একটা মেডিকেল কোম্পানির ডাইরি এনে একটা পাতা খুলে দিলেন। 

-হ্যাপি পিল-

বৃষ্টিভেজা দুপুরে, জানলার ধারে বসে ছিল সে।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল ধীরে—
যেন শালবনের ভিতর দিয়ে কুয়াশা হাঁটছিল।
টেবিলের কোণে রাখা ছোট্ট কাচের শিশি--
তার ভেতরে দু’-একটা “হ্যাপি পিল”।
নামটা শুনলেই হাসি পায়—
সুখ কি কখনও ওষুধে মাপে মানুষ?
তবু কিছু কিছু সন্ধ্যা আসে,
যখন শহরের সমস্ত শব্দ হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
প্রিয় মুখগুলো দূরে সরে যায়,
আর বুকের ভিতর
একটা নির্জন নদী শুধু বয়ে যায় চুপচাপ।
সেইসব রাতে একটা পিল নয়,
আসলে দরকার হয়—
কারও কণ্ঠস্বর,ভেজা মাটির গন্ধ,
অথবা দূরের ট্রেনের হুইসেল।
জঙ্গল যেমন নিজের অন্ধকার নিজেই বহন করে,
মানুষও তেমন।
তাই “হ্যাপি পিল” খেয়ে হয়তো একটু ঘুম আসে,
কিন্তু সত্যিকারের সুখ—
সে তো হঠাৎ পাওয়া বুনো ফুলের মতো,
অপ্রস্তুত কিন্তু গভীর।
----

দুবার পড়লাম। মন টা ধরে এল, কেমন যেন। বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ ডাকছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। আমি বুঝলাম, মানুষের জীবনেও কিছু দুঃখ থাকে, যেগুলোকে সারিয়ে তোলা যায় না। আর, তোলা উচিতও না। কারণ কিছু কষ্টই মানুষকে মানুষ রাখে। অনুমতি নিয়ে মোবাইলে একটা লেখাটার ছবি তুলে নিলাম।

আজকাল শহরে হাঁটলে দেখি সবাই খুব হাসছে। ক্যাফেতে, মলে, অফিসে—সব জায়গায় চকচকে সুখ। কিন্তু কখনো কখনো সেই হাসিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, যেন প্লাস্টিকের ফুল। দেখতে সুন্দর, গন্ধ নেই।

আমরা এখন এমন এক সময়ে বেঁচে আছি, যেখানে মানুষ দুঃখকে ভয় পায়। তাই সবাই তাড়াতাড়ি একটা হ্যাপি পিল খুঁজে নেয়।

কেউ প্রেমে।
কেউ টাকায়।
কেউ খ্যাতিতে।
কেউ এ আই-এর মায়াবী কথায়।

কিন্তু গভীর রাতে, সব আলো নিভে গেলে, মানুষ আবার নিজের কাছেই ফিরে আসে। সেখানে কোনো ফিল্টার নেই।
কোনো স্ট্যাটাস নেই। কোনো অভিনয় নেই। শুধু একা মানুষ আর তার ভেতরের অন্ধকার।
সেই অন্ধকারকে পুরো মুছে ফেলার দরকার নেই।কারণ রাত না থাকলে ভোর এত সুন্দর লাগত না।

সেই বনবাংলোতে আর কোনোদিন যাওয়া হয়নি।
ডাক্তারবাবুর সঙ্গেও আর দেখা হয়নি। কিন্তু আজও কখনো খুব ক্লান্ত লাগলে, মনে পড়ে ওনার কথা।
“হ্যাপি পিল মানুষকে সুখী করে না। শুধু কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেয় যে সে একা।”
আর তখন আমিও জানলার বাইরে তাকাই। দেখি, কোথাও না কোথাও এখনও বৃষ্টি ঠিক  পড়ছেই।