ধর্ম একটি জীবনপ্রণালী
হিন্দুদের কাছে সমগ্র জীবনটাই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর একটা উপায় বা প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। বেদান্ত মতে প্রকৃতপক্ষে ঐহিক বা জাগতিক বলে কিছু নেই। এমনকি জাগতিক বলে পরিচিত যে সব বস্তু, সেগুলিও জাগতিক নয়, কারণ ব্যক্তির আধ্যাত্মিক জীবনে তাদেরও প্রভাব আছে। তাই ঐহিক এবং আধ্যাত্মিক বলে আলাদা দুটি জগত নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হিন্দুর সব কাজই উপাসনা। সঠিকভাবে করলে তা ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যায়, আর তা না করলে, ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে আসতে হয়। এমন কোনও কর্ম নেই যা আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনকে প্রভাবিত করে না। এই কারণেই স্বামীজী বলতেন, হিন্দুরা যখন ডাকাতি করে, তখনও একবার ধর্মকে ছুঁয়ে নেয়। কথাটা শুনলে হয়তো ভালো লাগে না কিন্তু এই কথার পিছনে যুক্তি আছে। হিন্দু ধর্ম একটি জীবনপ্রণালী, জীবনে চলার পথ। জীবনকে ধর্ম একটি বিশেষ সুরে বেঁধে দেয়, মানুষ বাস্তবে যা অথবা সে যা হতে চলেছে সেই সত্যের সঙ্গে তাকে যুক্ত করে দেয়। ধর্ম মানুষকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। ধর্ম মানুষকে বলে দেয়, কী আদর্শ তার পালন করা উচিত। যিনি ভাল মানুষ, তিনি সর্বদাই ভালো, সব পরিস্থিতিতেই ভালো। এমন নয় যে, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সৎ কিন্তু জীবিকার ক্ষেত্রে অসৎ। বস্তুত কোন ধর্মই ব্যক্তিত্বের এই বিভাজন বা বৈপরীত্য বরদাস্ত করে না। একজন মানুষের জীবনে যদি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থাকে, তাহলে অতি সাবধানে তিনি পা ফেলবেন যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট না হন। কারণ আধ্যাত্মিকভাবের মানুষ নিজের জীবনধারাটি সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। এমনকি তিনি যখন ছোটখাটো কাজ করেন তখনও ওই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই। হিন্দুরা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত না হলে কোন সভ্যতাই টিকতে পারে না। সেই কারণেই হিন্দু ঋষিগণ জাগতিকতা বর্জন করে জীবনকে এক প্রার্থনায় রূপান্তরিত করেছিলেন। হিন্দু ধর্ম স্বীকার করে, ইন্দ্রিয় সুখ বৈধ কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত, তারপর সম্পূর্ণভাবে তা পরিত্যাগ করতে হয়। সুখের জন্যই সুখ নয়। উদ্দেশ্য, ভোগের দ্বারা ত্যাগের পথে উত্তীর্ণ হওয়া। লক্ষ্য, ইন্দ্রিয়াতীত আনন্দ যা একমাত্র ঈশ্বরের অনুভব উপলব্ধি করলেই পাওয়া যায়।

