বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

ভূতেরা এখনও কলকাতার অলিতে-গলিতে

প্রকাশিত: ২৮ মে, ২০২৬
ভূতেরা এখনও কলকাতার অলিতে-গলিতে
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

অনীক দত্ত ও ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর অদ্ভুত উত্তরাধিকার

 

 

কলকাতা শহরটা আজ একটু বেশি নিঃশব্দ। মে মাসের এই আর্দ্র সন্ধ্যায়, হঠাৎ যেন ঘড়ির আওয়াজও কেমন বিষণ্ণ শোনায়। ২৭ মে, ২০২৬-এ অনীক দত্ত চলে যাওয়ার খবরটা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শহরটা বারবার নিজের দিকেই ফিরে তাকাচ্ছে। কারণ কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা শুধু সিনেমা বানান না—একটা সময়কে ধরে রাখেন। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছিল তেমনই এক আয়না, যেখানে কলকাতা নিজের অস্পষ্ট  মুখটা প্রথম স্পষ্ট দেখেছিল। আর আজ, সেই ছবির নির্মাতা নিজেই যেন শহরের সবচেয়ে প্রিয় ভূত হয়ে গেলেন।

কলকাতা শহরটা কল্লোলিনী তিলোত্তমা হলেও তার সঙ্গে  মৃত মানুষেদেরও শহর। এ শহরের টান কাটানো যমের ও অসাধ্য। এখনো এখানে ট্রামের ঘণ্টার মধ্যে পুরনো প্রেমিকার হাসি লেগে থাকে, কলেজ স্ট্রিটের ভেজা বইয়ের গন্ধে মিশে থাকে এমন সব কবির নিঃশ্বাস, যাঁরা বহুদিন আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। সন্ধের পরে কলকাতার পুরনো বারান্দাগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, কেউ যেন এখনও দাঁড়িয়ে আছে—ধুতি পরে, হাতে লণ্ঠন, চোখে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। এই শহরে ভূতেরা কখনও ভয় দেখায় না। তারা গল্প বলে। আর সেই গল্পকেই এক সিনেমা বানিয়েছিলেন অনীক দত্ত। সিনেমার নাম—ভূতের ভবিষ্যৎ। বাংলা সিনেমা বহুদিন এমন ছবি পায়নি, যেটা একইসাথে  ব্যঙ্গ, নস্টালজিয়া, রাজনৈতিক মন্তব্য এবং নিখাদ বিনোদন হতে পারে। ছবিটা মুক্তি পাওয়ার পরে অনেকেই হেসেছেন, কেউ কেউ সংলাপ মুখস্থ বলেছেন, কিন্তু আসল ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। ছবিটা আসলে কলকাতার আত্মজীবনী।

একটা শহর যখন নিজের স্মৃতি হারাতে থাকে, তখন সে প্রথমে নিজের বাড়িগুলো ভাঙে। তারপর ভাষা বদলায়। তারপর মানুষ বদলায়। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এ সেই ভাঙনটাকেই অনীক দত্ত আশ্চর্য রসবোধে ধরেছিলেন। একটা পুরনো বাড়ি—যেখানে বিভিন্ন যুগের ভূতেরা বাস করে। ইংরেজ আমলের সাহেব, জমিদার, থিয়েটারের অভিনেত্রী, বিপ্লবী, বাঙালি মধ্যবিত্ত—সবাই সেখানে আছে। যেন ইতিহাসের একটা ওয়েটিং রুম। কিন্তু  রিয়েল এস্টেট-এর নির্মম সময় সেখানে বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়। এখানেই ছবিটা কেবল কমেডি থাকে না। এটা হয়ে ওঠে সময়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কলকাতায় যারা বড় হয়েছে, তারা জানে—একটা পুরনো বাড়ি ভেঙে গেলে শুধু ইট ভাঙে না, ভেঙে যায় বিকেলের রোদ, ছাদের আড্ডা, শীতের দুপুরে কম্বল মুড়ি দিয়ে গল্প শোনার স্মৃতি। অনীক দত্ত সেই কালেকটিভ লস-টাকে ক্যামেরায় ধরেছিলেন।

শহর আসলে মানুষের ভেতরেই থাকে। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দেখলে সেই কথাটাই মনে পড়ে।ছবিটার সবচেয়ে বড় শক্তি তার হিউমার নয়—তার বিষাদ। আমরা হাসতে হাসতেই বুঝতে পারি, এই ভূতেরা আসলে অচল হয়ে যাওয়া মানুষ। যাদের এই নতুন শহর আর চায় না। আজকের চকচকে মল কালচার-এর মধ্যে ওল্ড ক্যালকাটা কোথাও যেন রিফিউজি হয়ে গেছে। এই সিনেমা সেই রিফিউজি -দের হয়ে কথা বলে।

বাংলা ছবিতে স্যাটায়ার নতুন নয়। কিন্তু অনীক দত্তের ভাষা ছিল অন্যরকম। তাঁর সংলাপে একইভাবে ছিল থিয়েটারের ছন্দ, কফি হাউসের রসবোধ আর নিউজপেপার কার্টুণের তীক্ষ্ণতা। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর সংলাপগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরেছিল কারণ সেগুলো স্ক্রিপ্টেড ডায়ালগ ছিল না, যেন কলকাতার নিজস্ব কথা। একটা শহর যখন নিজেকে নিয়ে হাসতে পারে, তখনই সে সত্যিকারের জীবিত থাকে।
এই ছবিটা সেই সাহস দেখিয়েছিল।

এই ছবিটা জনপ্রিয় হবার আর একটা বড় কারণ ছিল প্রাসঙ্গিকতা। কারণ শহর এখনও বদলাচ্ছে। পুরনো সিনেমা হল বন্ধ হচ্ছে। বইয়ের দোকান হারিয়ে যাচ্ছে। পাড়ার নাটকের দল ভেঙে যাচ্ছে। আর আমরা ক্রমশ স্মৃতিহীন হয়ে উঠছি। এই সময়েও ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দেখলে মনে হয়, ছবিটা যেন আজ সকালেই তৈরি হয়েছে। এটা সত্যিই রেয়ার কোয়ালিটি।

ভালো শিল্প সময়ের সঙ্গে পুরনো হয় না—বরং সময় যত যায়, তত নতুন অর্থ খুঁজে পায়।
অনীক দত্তের এই ছবিটা ঠিক তেমন। কিছু সিনেমা শেষ হয়ে যায় এন্ড ক্রেডিট উঠলেই। আর কিছু সিনেমা শেষ হওয়ার পরে শুরু হয়। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দ্বিতীয় ধরনের ছবি। আজও কোনও পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়ালে, হঠাৎ মনে হয়—জানলার ফাঁক দিয়ে কেউ হয়তো তাকিয়ে আছে।
কোনও বৃদ্ধ থিয়েটার অভিনেতা, কোনও ব্যর্থ কবি, কোনও ইংরেজ সাহেব, কিংবা উত্তর কলকাতার এক ফরগটেন বাঙালি। তারা এখনও শহর ছাড়েনি। কারণ কলকাতার ভূতেরা কখনও পুরোপুরি মরে না। আর সেই কারণেই ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ শুধু একটা সিনেমা নয়—এটা কলকাতার  কালেক্টিভ মেমোরি।

আজ রাতেও হয়তো কলকাতার কোনও পুরনো বাড়ির কার্নিশে বৃষ্টি পড়বে। কোনও ফাঁকা সিনেমা হলের দরজায় হাওয়া এসে ধাক্কা মারবে। আর আমরা, যারা ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দেখে একদিন হেসেছিলাম, তারা হঠাৎ বুঝতে পারব—সেই হাসির ভেতর কতখানি একাকিত্ব লুকিয়ে ছিল। অনীক দত্ত নেই, কিন্তু তাঁর তৈরি ভূতেরা রয়ে গেছে। তারা এখনও কলকাতার অলিতে-গলিতে হাঁটে, পুরনো বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে, আর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শহর কখনও শুধু ইট-পাথরে তৈরি হয় না, তৈরি হয় স্মৃতি দিয়ে। কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরেও তাই শেষ হয়ে যান না। তারা ধীরে ধীরে শহরেরই অংশ হয়ে যান।

আরও অবকাশ খবর