সর্বশেষ খবর
বাংলার মিষ্টিতে অনন্য রত্ন: বাঁকুড়ার ‘মেচা সন্দেশ’
প্রকাশিত: ১ জুন, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ রসগোল্লা, সন্দেশ বা ল্যাংচার মতো ছানা-ভিত্তিক মিষ্টির ভিড়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক স্বাদ নিয়ে শত শত বছর ধরে টিকে রয়েছে বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড়ের বিখ্যাত মেচা সন্দেশ। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের জন্মভূমি এই বেলিয়াতোড় যেমন তার শিল্পের জন্য পরিচিত, তেমনই ভোজনরসিক বাঙালির কাছে এর পরিচয় এই জিভে জল আনা মিষ্টির জন্য। ছানা বা দুধের মূল ব্যবহার ছাড়াই তৈরি এই মিষ্টির স্বাদ ও গন্ধ যেকোনো সাধারণ মিষ্টিকে অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে।
শত বছরের প্রাচীন ইতিহাস
মেচা সন্দেশের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং গৌরবময়। মনে করা হয়, ১৭ শতকের দিকে (আনুমানিক ১৬২৫-১৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) বাঁকুড়ার মল্ল রাজাদের আমলে এই মিষ্টির উৎপত্তি। সেই সময় রাঢ়বঙ্গের এই শুষ্ক অঞ্চলে তীব্র দুধ ও ছানার অভাব দেখা দিয়েছিল। অথচ রাজপরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মিষ্টির চাহিদা ছিল তুঙ্গে। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বেলিয়াতোড়ের এক অজ্ঞাতনামা রন্ধনশিল্পী ছানার বিকল্প হিসেবে ছোলার ডালের গুঁড়ো বা বেসন ব্যবহার করে এই মিষ্টি উদ্ভাবন করেন। অন্য একটি লোককথা অনুযায়ী, স্থানীয় বাবা ধর্মদাসের মেলা ও পুজোকে কেন্দ্র করেও এই মিষ্টির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমানে বেলিয়াতোড়ের প্রায় ১৫-২০টি মোদক পরিবার বিগত ছয়-সাত পুরুষ ধরে এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরির পেশা বাঁচিয়ে রেখেছেন।
রন্ধনশৈলী ও তৈরির পদ্ধতি
মেচা সন্দেশ তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং এটি অন্য পাঁচটা মিষ্টির থেকে একেবারেই আলাদা:
• বেসনের তাল তৈরি: প্রথমে ছোলার ডাল ঢেঁকিতে বা মেশিনে পিষে মিহি বেসন তৈরি করা হয়। সেই বেসনকে ঘিয়ে ভালো করে ভেজে মণ্ড বা তাল পাকানো হয়।
• ক্ষীরের মিশ্রণ: এরপর সেই ভাজা বেসনের গুঁড়োর সঙ্গে মেশানো হয় খাঁটি ক্ষীর বা খোয়া ক্ষীর, চিনি এবং সুগন্ধি এলাচ গুঁড়ো।
• আকার ও চিনির প্রলেপ: এই মিশ্রণটি সামান্য গরম থাকা অবস্থাতেই হাতের ছোঁয়ায় ছোট ছোট গোল লাড্ডুর আকার দেওয়া হয়।
• রসায়ন বা সুগার কোটিং: সবশেষে এই গোল সন্দেশগুলিকে গরম গাঢ় চিনির রসে ডুবিয়ে তুলে নেওয়া হয়। ঠাণ্ডা হলে সন্দেশের ওপর চিনির একটি হালকা, মুচমুচে সাদা আস্তরণ বা ‘টুপি’ তৈরি হয়। দেখতে অনেকটা টুপি পরা লাড্ডুর মতো হয় বলেই এর গঠনশৈলী নজরকাড়া।
অনন্য বৈশিষ্ট্য -
মেচা সন্দেশের সবচেয়ে বড় সিক্রেট বা ইউএসপি হলো এর দীর্ঘ স্থায়িত্ব। যেহেতু এতে সরাসরি ছানার ব্যবহার হয় না এবং ওপরের চিনির আস্তরণটি বাতাস ঢুকতে বাধা দেয়, তাই এই মিষ্টি সাধারণ তাপমাত্রায় রেখেও সপ্তাহর পর সপ্তাহ অনায়াসে খাওয়া যায়। এটি নষ্ট হয় না। কামড় দিলেই প্রথমে চিনির মুচমুচে আবরণ এবং তারপর ভেতরে ঘিয়ে ভাজা বেসন ও ক্ষীরের নরম ও সুস্বাদু মেলবন্ধন মুখে এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়।
জিআই ট্যাগের স্বীকৃতি
বাঁকুড়া-দুর্গাপুর রাজ্য সড়কের ওপর অবস্থিত বেলিয়াতোড়ের এই মিষ্টির সুখ্যাতি এখন আর শুধু বাঁকুড়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। জয়নগরের মোয়া বা বর্ধমানের মিহাদানার মতো বাঁকুড়ার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির আন্তর্জাতিক পরিচিতির জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) ট্যাগের আবেদন করা হয়েছে। 'ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিক্যাল সায়েন্সেস'-এর মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি এই আবেদন প্রক্রিয়াটি চালায়। ইতিমধ্যেই এই মিষ্টি জিআই পাওয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই তকমা সম্পূর্ণভাবে পেয়ে গেলে বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ বিশ্ব দরবারে এক নতুন পরিচয় লাভ করবে।

