বেদান্তের প্রকৃত শিক্ষা
এই জগৎ, জগতের বিভিন্ন বস্তু, তোমার মনের বৃথা ও স্বার্থপর আকাঙ্খা পূর্ব থেকেই তোমাকে সম্মোহিত করে রেখেছে। তুমি ইতোমধ্যেই এক সম্মোহিত ব্যক্তি। তুমি হয়তো এই বিষয়ে সচেতন বা সচেতন নও। প্রকৃতপক্ষে বেদান্ত উচ্চস্তরের মানসিক ও নৈতিক অনুশীলন ছাড়া আর কিছুই নয়— স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ তাঁর বেদান্ত বিষয়ক একটি বক্তৃতায় একথা বলছেন। তিনি বলছেন, বেদান্ত অনুশীলনের ফলে তুমি যে বন্ধনের মধ্যে এখন রয়েছো সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হতে সক্ষম হবে এবং তোমার মধ্যেকার সকল অহংকার ও স্বার্থপর কামনাগুলিকে দূর করতে পারবে। এর ফলে তুমি নিজেকে বন্ধনহীন ও ত্রুটিবিহীন করে তুলতে পারবে—একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারবে। বেদান্ত মানুষের সঙ্গে জগতের সম্পর্কটি স্থায়ীভাবে এবং অত্যন্ত সুচারুরূপে প্রতিষ্ঠিত করে। যেমন একজন দ্বৈতবাদী বা বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী বেদান্তী বলেন - আমি নই তুমি। হে ঈশ্বর! এই সব কিছুই তুমি। অর্থাৎ বেদান্তবাদী হিসেবে সে তার নিজের অহং বোধকে বিনষ্ট করে এবং সেই স্থানে ঈশ্বরকে বসায়। সব কিছুই ঈশ্বর। সে সর্বভূতে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে এবং সর্বোত্তম আনন্দের সঙ্গে তার জীবনকে উৎসর্গ করতে পারে। আবার একজন অদ্বৈতবাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তিনি বলেন যে, একমাত্র আত্মারই অস্তিত্ব আছে। মায়া বা অবিদ্যার কারণেই আমরা এই বিশ্ব জগতকে বিবিধ নাম ও রূপে প্রকাশিত হতে দেখি। এই সৃষ্টি হল আপাত। আসলে তা বহু নয়, বরং এক। আত্মা ভিন্ন তা আর কিছুই নয়। সোহহম্ সোহহম্। অর্থাৎ বেদান্তবাদী যে পথেই যাক না কেন, সে কখনোই এই জগতকে কোন প্রকার স্বার্থপর ও অভিসন্ধি নিয়ে দর্শন করতে সমর্থ্য হবে না। সকল প্রকার দ্বন্দ্ব, বিরাগ,ঈর্ষা ইত্যাদি সবকিছুর ঊর্ধ্বে সে উঠে যায়। তখনই সে তার এই পার্থিব ও নশ্বর জীবনটিকে জগতের মঙ্গলের জন্য উৎসর্গ করতে পারে। কারণ সেই অনুভব করেছে, যে আত্মাটি তার মধ্যে বিরাজিত, তা অবিনশ্বর এবং সর্বব্যাপী। সে শরীর নয়, ইন্দ্রিয় নয়, মন এবং এধরনের অন্য কিছু নয়, এমনকি এসবের মিশ্রণও নয়। সে এবং পরমাত্মা—এক। সে এবং জগত—এক। বেদান্ত তোমাকে বলে—তুমি যা পছন্দ কর তাই কর, তুমি জীবনের যে পর্যায়ে থাকতে চাও থাকো, কেবল নিজের আত্মাকে বিস্মৃত হয়ো না এবং শরীর, মন, ইন্দ্রিয় ও জগতের বস্তু সকলের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে ফেলো না। তুমি নিজে তাদের অধীনস্থ হোয়ো না, বরং সেগুলিকে নিজের অধীনে করার চেষ্টা করো। এটিই হল বেদান্তের প্রকৃত শিক্ষা। তুমি যদি প্রকৃত বেদান্তী হও তাহলে তুমি একজন ভালো ও সফল কর্মী হবে। কিছুই তোমার হারানোর থাকবে না বরং তুমি ধীরে ধীরে সবকিছুই লাভ করবে। বেদান্ত হলো সকল অর্থকরী বিজ্ঞানের ভিত্তি।

