বিনু সৎসঙ্গ ন হরিকথা
সংকলক: সন্দীপ সিনহা
তুলসীদাসজী তাঁর একটি দোঁহাতে বলছেন —"বিনু সৎসঙ্গ ন হরিকথা ত্যহি বিনু মোহন ভাগ। মোহ গয়ে বিনু রামপদ হোয়ে দৃঢ় অনুরাগ।" অর্থাৎ সৎসঙ্গ ছাড়া হরিকথা শোনা যায় না; আর হরিকথা ছাড়া সংসারের মোহও যায় না। মোহ না গেলে হরিপদে সুদৃঢ় অনুরাগ হয় না। সৎসঙ্গের মাহাত্ম্য আমাদের শাস্ত্রে বহুবার বলা হয়েছে এবং অতি সাধারণ মানুষও বোঝে এই প্রবাদ বাক্যটির অর্থ—সৎসঙ্গে স্বর্গ বাস আর অসৎসঙ্গে নরকবাস। সৎ- এর সঙ্গে থাকলে বুদ্ধির জড়তা যায়, মুখ থেকে সত্যবাক্য নির্গত হয়, চিত্ত মার্জিত হয় আর দিগ্ দিগন্তে কীর্তি প্রকাশিত হয়। শাস্ত্রবাক্যে আছে— "গঙ্গা পাপং শশী তাপং দৈন্যং কল্পদ্রুম হরেৎ। পাপং তাপং তথা দৈন্যং সদ্য সাধু সমাগমঃ।" অর্থাৎ গঙ্গা পাপ নাশ করেন, চন্দ্র তাপ ও কল্পতরু দৈন্য দূর করেন ; কিন্তু পাপ- তাপ ও দৈন্য- এই তিনটিই সদ্য নাশ হয় একমাত্র সাধুসঙ্গে। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে — তীর্থের জল ও মাটি, দীর্ঘকাল মূর্তিপূজা ও সেবা মানুষকে পবিত্র করে। কিন্তু তত্ত্বজ্ঞ সাধুদের দর্শন করলেই মন শুদ্ধ হয়। এরাই জঙ্গমতীর্থ ও ভগবানের চলমান বিগ্ৰহ। অবশ্য প্রকৃত সাধুকে চিনতে হবে। আর শুধু সাধুসঙ্গই যথেষ্ট নয়, তাঁদের সঙ্গে ভগবৎ- প্রসঙ্গ করতে হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, সাধুসঙ্গ একদিন করলে হয় না, সর্বদাই দরকার। সাধুদের উপদেশ মেনে চলতে হয়, শুধু শুনলে হয় না। সাধুসঙ্গে নিজের ঘড়ি অনেকটা ঠিক করে লওয়া যায়। আমরা সমাজজীবনে দেখি কি সুন্দরভাবে তথাকথিত অনেক শিক্ষিত মানুষ সৎসঙ্গে মেলামেশা করতে জানেন না। অসৎ মানুষ গুলো আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক একই জায়গায় একই গোষ্ঠীতে মিলিত হয়ে যায়। আসলে ভগবানের কৃপা না হলে সাধুসঙ্গও পাওয়া যায় না। অসৎ সঙ্গের প্রভাবে কত মানুষ নিম্নগামী হয়ে পাশবিক স্তরে নেমে যায়। অনেক সময় তারা এটা বুঝতেও পারেনা। আবার সাধুসঙ্গের প্রভাবে দস্যু রত্নাকর থেকে বাল্মিকী হয়ে ওঠার দৃষ্টান্ত এখনও সমানভাবে দেখা যায়।

