বোধি বৃক্ষ - ভক্তির প্রকারভেদ
সংকলক: সন্দীপ সিনহা
ইষ্টি আর পুরোহিত/ যাহা হতে সর্বস্থিত/ তারা যদি আসে বাড়ি পরে,/ শুধু হাতে প্রণামেতে/ ভার হয়ে যান তাতে/ মুখে হাসি অন্তরে বেজার।/ তিন টাকা নগদে দিলে / চরণ তুলি মাথা পরে/ প্রসন্ন বদনে দেন বর।— এই শ্লোকগুলির মধ্যে যে সত্যটুকু বর্ণনা করা হয়েছে তা আমাদের সমাজে কী প্রচলিত এবং সর্ববাদিসম্মত নয়? একদিকে টাকার কী আশ্চর্য ক্ষমতা তা যেমন তুলে ধরা হয়েছে আর অন্যদিকে টাকার ক্ষমতার চেয়েও মানুষের মনের এক অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে যার প্রভাবে একজন মানুষ একই সময়ে একই লোককে যুগপৎ ভক্তি ও অশ্রদ্ধা করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, সাধারণত গুরুপুরোহিত যে সাধু পুরুষ নন, সামান্য বিষয়ীলোকের মতো টাকার প্রতি তাঁর যে বিলক্ষণ লোভ আছে সে সম্বন্ধে আমাদের কিছুমাত্র অন্ধতা নেই তথপি তাঁর পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে আমরা কৃতার্থ হয়ে থাকি কেননা গুরু ব্রহ্মা। এইরূপ ভক্তি দ্বারা আমরা যে নিজেকে অপমানিত করি আমরা তা মনেই করি না। উপযুক্ত ব্যক্তিকে সম্মান করাই আত্মসম্মান তা আমরা মনেই করি না। কিন্তু অন্ধভক্তি অন্ধ মানুষের মতো অভ্যাসের পথ দিয়ে অনায়াসে চলে যায়। সকল দেশেই এর নজির আছে। আমাদের মনের মধ্যে স্বভাবতই অনেকটা পরিমাণে জড়ধর্ম আছে। সেই কারণে আমাদের মন অভ্যাসের গড়ানো পথে মোহের আকর্ষণে আপনিই পাথরের মতো গড়িয়ে পড়ে, যুক্তি তার মাঝখানে বাধা দিতে এলে যুক্তি চূর্ণ হয়ে যায়। যে ক্ষমতার কাছে মস্তক নত করলে মস্তকের অপমান হয়, যেমন টাকা পদবী বা পদ গায়ের জোর এবং অমূলক প্রথা—যাকে ভক্তি করলে ভক্তি নিষ্ফলা হয়, অর্থাৎ চিত্তবৃত্তির প্রসার না ঘটে কেবল সংকোচ ঘটে। এই দুর্দান্ত শাসন থেকে মনকে স্বাধীন ও ভক্তিকে মুক্ত করা মনুষ্যত্ব রক্ষার প্রধান সাধনা। তাই অমূলক বিনতি ও অস্থানে বিনতি সেই কারণেই দুর্গতি নিয়ে আসে। হীনকে ভক্তি করে হীনতা লাভ হয় অযোগ্যের নিকট নত হলে অযোগ্যতা লাভ হয়।

