বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

আর এক কাপ চা হবে নাকি?

প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২৬
আর এক কাপ চা হবে নাকি?
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon


২১শে মে, বিশ্ব চা দিবস উপলক্ষে 

লেখকঃ দীপ্র ভট্টাচার্য


বিকেলের চায়ের রং কখনও একরকম হয় না। শীতের বিকেলের চা একটু ধূসর হয়—যেন পুরোনো কোনও কম্বলের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা নিঃশ্বাস। বর্ষার দিনে তার ভেতরে মাটির গন্ধ মেশে, কাদামাখা পথের গন্ধ, ভেজা পাতার গন্ধ, দূরে কোথাও ট্রেন চলে যাওয়ার গন্ধ। আর গ্রীষ্মের দীর্ঘ, ক্লান্ত দুপুরে চা যেন কেবল চা থাকে না—মনে হয়, কেউ নিঃশব্দে কপালে হাত রেখে বলছে, “বিশ্রাম নাও একটু, এত তাড়া কিসের?”

আমার আজকাল প্রায়ই মনে হয়, মানুষের জীবনে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জিনিসগুলোর মধ্যে চা একটা। মানুষ বদলায়। শহর বদলায়। রাস্তার নাম বদলায়। প্রেম বদলায়। এমনকি নিজের ভেতরের মানুষটাও একদিন আয়নায় তাকালে অচেনা লাগে। কিন্তু চায়ের কাপের ভেতর থেকে যে ধোঁয়াটা উঠে আসে, তার মধ্যে আশ্চর্য রকমের এক চিরকাল আছে। সেই ধোঁয়া যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্ষণস্থায়ীত্বের বিরুদ্ধে এক ছোট্ট প্রতিবাদ।

আমি বহুদিন ধরেই লক্ষ্য করেছি, মানুষ যখন খুব সুখী হয়, তখনও চা খায়। আবার খুব দুঃখী হলেও চা খায়। এই এক অদ্ভুত পানীয়, যা আনন্দেরও সঙ্গী, বিষণ্নতারও সঙ্গী। হাসপাতালে রাত জেগে থাকা লোকের হাতেও চায়ের কাপ থাকে, আবার প্রথম প্রেমে পড়া ছেলেটার হাতেও। কেউ চাকরি পেয়ে চা খায়, কেউ ব্যাবসায় লস করে। যেন জীবনের প্রতিটি বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব কেটলি, যার ভেতরে ধীরে ধীরে ফুটছে মানুষের দিনরাত্রি।

বারান্দা আমার খুব প্রিয়। বিশেষ করে যেসব বারান্দা থেকে সবুজ দেখা যায়। কৃষ্ণচূড়া, শিমূল, আমগাছ, অথবা দূরের কোনও নাম-না-জানা গাছ। সেইসব বারান্দায় বিকেলে চা খেতে খেতে মনে হয়, সময় আসলে এগোয় না। একই জায়গায় বসে থাকে। শুধু মানুষগুলো পালটে যায়। আলো পালটে যায়। কণ্ঠস্বর পালটে যায়।

আমাদের বাড়িতে বাবা চা খেতেন খুব আস্তে। এত আস্তে যে, মনে হত, তিনি বোধহয় চা খাচ্ছেন না, চায়ের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁর চায়ের কাপ থেকে কখনও শব্দ হত না। শুধু ধোঁয়া উঠত। বাবা বারান্দায় বসতেন। সামনের সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকতেন দীর্ঘক্ষণ। কখনও মনে হত তিনি গাছের দিকে তাকিয়ে নেই—আরও দূরে কোথাও তাকিয়ে আছেন। আমি কোনওদিন জিজ্ঞেস করিনি, তিনি কী ভাবতেন। এখন মনে হয়, হয়তো কিছুই ভাবতেন না। মানুষের বয়স বাড়লে, ভাবনার থেকেও চুপ করে থাকা বেশি দরকার হয়। পৃথিবী তখন আর ব্যাখ্যা চায় না, শুধু নীরবতা চায়। বাবার কাপটা ছিল সাদা বোন চায়নার। কাপের ধারে হালকা সোনালি রঙের সরু একটি রেখা। সেই কাপটা এখনও আছে। শুধু বাবা নেই। অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষ চলে গেলে তার ব্যবহারের জিনিসগুলো আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। বাবার কাপের হাতলে আজও তাঁর আঙুলের অভ্যাস লেগে আছে বলে মনে হয়। আসলে, চায়ের সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক খুব গভীর। সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনও পানীয় মানুষের স্মৃতিকে এত নিঃশব্দে জাগিয়ে তুলতে পারে না। কফি একটু শহুরে, একটু উচ্চকণ্ঠ। মদে বিস্মৃতি আছে। কিন্তু চায়ে আছে ফিরে দেখা। পুরোনো দুপুর। ফেলে আসা মানুষ। অসমাপ্ত কথাবার্তা।

দার্জিলিং-এ আমার জ্যাঠা থাকতেন চাকরিসূত্রে। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদে কাজ করতেন। ছুটি পেলেই যাওয়া হত তাঁর বাড়ি—“কাঞ্চনি”। নামটার মধ্যেই পাহাড়ি কুয়াশা ছিল। বাড়িটার বারান্দা থেকে দূরের পাহাড় দেখা যেত। ভোরবেলা সেগুলো সাদা থাকত, আর সন্ধের পরে কেবল অন্ধকার। উত্তরবঙ্গের বহু চা-বাগান ছিল তাঁর এক্তিয়ারে। ওনার সঙ্গে চা-বাগান গেলে আমার মনে হত, পৃথিবীতে সবুজেরও যদি কোনও সাম্রাজ্য থাকে, তবে সেটা বোধহয় চা-বাগান। সারি সারি ছোটগাছ, তাদের ফাঁকে কুয়াশা, দূরে শ্রমিকদের মাথার কাপড়ের রং—লাল, হলুদ, নীল। যেন পাহাড়ের বুকের উপর কেউ খুব যত্ন করে রঙিন বিন্দু এঁকে দিয়েছে। অনেকবার গিয়েছিলাম নানা নামী চা-বাগানে। বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছিল চা তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটা দেখার। তখন বুঝেছিলাম, এক কাপ চায়ের ভেতরে শুধু পাতা থাকে না—থাকে বৃষ্টি, কুয়াশা, শ্রম, পাহাড়ি মেয়েদের গান, আর অগণিত নীরব সকাল।

একবার ডিসেম্বর মাসে দার্জিলিং গিয়েছিলাম। পাহাড়ে তখন বিকেল খুব তাড়াতাড়ি নামে। আলো নিভে যাওয়ার আগে আকাশের রং একবার অদ্ভুত কমলা হয়ে ওঠে। সেই বিকেলে কাঞ্চনির ছোট্ট বারান্দায় বসেছিলাম। ঠাকুমা চা করে এনে দিয়েছিলেন। মাটির রঙের মতো রঙের চা। ধোঁয়া উঠছিল ধীরে ধীরে। আমি গল্পে মশগুল হয়ে চা খেতে দেরি করছিলাম। ঠাকুমা খুব আস্তে বলেছিলেন, “চা ঠান্ডা হয়ে গেলে আমার কিন্তু মন খারাপ হয়ে যায়।” 
বাক্যটা আজও ভুলতে পারিনি। মানুষেরও বোধহয় তাই। খুব বেশি সময় অবহেলায় পড়ে থাকলে, মানুষের ভেতরটাও ঠান্ডা হয়ে যায়। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু কোথাও একটা উষ্ণতা নিভে যায়।

চায়ের মধ্যে একটা নরম বিষণ্ণতা আছে। যারা খুব একা থাকে, তারা সেটা বোঝে। বাড়ি ফিরে সব কাজ মিটে যাওয়ার পরে, ঘরের আলো একটু কমিয়ে, জানলার পাশে বসে এক কাপ চা খাওয়ার মধ্যে যে নিঃসঙ্গ সুখ আছে, তার তুলনা হয় না। তখন বাইরের পৃথিবী আর নিজের ভেতরের পৃথিবীর মাঝখানে ধোঁয়ার একটা পর্দা তৈরি হয়। মানুষ তখন নিজের কাছাকাছি আসে। পরীক্ষার আগে, অনেক রাত আমি এভাবেই কাটিয়েছি। দূরে কুকুর ডাকছে। কোনও অচেনা ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসছে। ঘুম-কাটানো ফ্লাস্কের চায়ের কাপের পাশে জমছে এক ফালি নীরবতা। সেই সময় মনে হয়, পৃথিবীতে আসলে সবাই একা। শুধু কেউ সেটা লুকোতে পারে, কেউ পারে না।

আমার মনে হয়, চা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ চা শেষ হয়ে যায়। তাই আবার বানাতে হয়। জীবনে কিছু কিছু পুনরাবৃত্তি না থাকলে মানুষ বাঁচতে পারে না। প্রতিদিনের চা সেই পুনরাবৃত্তির মতো। যেন প্রতিদিন ভেঙে পড়া মানুষটিকে আবার একটু জোড়া লাগানো। মানুষ আসলে খুব ভঙ্গুর প্রাণী। বাইরে থেকে যত শক্তই দেখাক, ভিতরে ভিতরে সে প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙে। সারাদিনের খাটুনি, ক্লান্তি—সব মিলিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। তারপর একসময় সন্ধেবেলা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আবার নিজেকে জোড়া দেয়।

রাস্তার চায়ের দোকানগুলোকে আমি খুব মন দিয়ে দেখি। বিশেষ করে ভোরবেলার দোকান। দোকানদার তখন কেটলির মুখ খুলছে। পাতার গন্ধ উঠছে। দুধ ফুটছে। দূরে বাসস্ট্যান্ডে প্রথম বাস ঢুকছে। আকাশে আলো পুরো ফোটেনি এখনও। পৃথিবী যেন পুরো জেগে ওঠার আগে একবার চা খেয়ে নিচ্ছে। কলকাতার চায়ের দোকান আসলে শহরের ক্ষুদ্রতম সংসদ। এখানে রাজনীতি হয়, প্রেম হয়, সাহিত্য হয়, বিচ্ছেদ হয়, চাকরি না-পাওয়ার হতাশা হয়, আবার নতুন স্বপ্নও জন্ম নেয়। এক কাপ চায়ের উপর ভর করেই এই শহর এতদিন বেঁচে আছে।  চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে কত মানুষ যে পৃথিবী বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, তার হিসেব নেই। অথচ শেষে দেখা গেছে, পৃথিবী খুব একটা বদলায়নি। শুধু চায়ের ভাঁড় বদলেছে। দোকান বদলেছে। মুখগুলো বদলেছে। তবু বিকেলের আলো নেমে এলে এখনও কোথাও না কোথাও কেউ বলছে—“দাদা, দুটো লাল চা দিন তো।”

চায়ের আসল স্বাদ কিন্তু সবসময় পাতা থেকে আসে না। আসে পরিস্থিতি থেকে। পরীক্ষার সময় রাত জেগে পড়ার সময় চা একটা আলাদা শক্তি। তখন মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত জেগে থাকা মানুষ হয়তো এই মুহূর্তে কোথাও না কোথাও চা খাচ্ছে। বৃষ্টির দিনে চায়ের স্বাদ একরকম। অসুখের সময়ে আরেকরকম। প্রিয় মানুষের সঙ্গে খেলে অন্যরকম। আর কাউকে হারানোর পরে—সবচেয়ে আলাদা। শ্মশানে চা খাওয়াটা তো এখন একটা রিচুয়াল। আগুনের গন্ধ, ভোরের কুয়াশা, নিঃশব্দ মুখ—সবকিছুর মাঝখানে হঠাৎ কেউ এসে বলে, “চা খান।” সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, মানুষ আসলে মৃত্যু নয়, উষ্ণতাকেই আঁকড়ে বাঁচতে চায়। চায়ের ধোঁয়া খুব দ্রুত মিলিয়ে যায়। এই জিনিসটা আমাকে সবসময় অদ্ভুত কষ্ট দেয়। এক মুহূর্ত আগে যা দৃশ্যমান ছিল, পরের মুহূর্তেই নেই। মানুষের জীবনও বোধহয় তাই। আমরা খুব অল্প সময়ের জন্য উষ্ণ থাকি। তারপর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাই। মানুষ আসলে চা বানায় না। মানুষ শেখে, কীভাবে অন্য একজন মানুষকে একটু উষ্ণতা দেওয়া যায়। মায়ের চায়ে তাই চিনি বেশি হলেও ভালো লাগত। কারণ সেখানে একটা সংসারের মিষ্টি গন্ধ ছিল। তবু মানুষ প্রতিদিন চা বানায়। কারণ মানুষ আসলে আশা করতে ভালোবাসে। যতদিন কেটলিতে জল ফুটছে, যতদিন বিকেলে কেউ বলছে “এক কাপ চা হবে?”, ততদিন জীবন পুরোপুরি হার মানেনি।

অনেক বছর আগে একটা কনসাল্টিং-এর কাজের সূত্রে এক টি-টেস্টারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।কথা বলতো খুব ধীরে। যেন প্রতিটি শব্দ আগে একটু ভিজিয়ে নিতো। সে বলেছিলো, “ভালো চা চিনতে গেলে ধৈর্য লাগে। তাড়াহুড়ো করলে শুধু গরম জলই খাওয়া হয়।”
কথাটা শুধু চায়ের জন্য নয়। মানুষের ক্ষেত্রেও সত্যি। আজকাল পৃথিবীতে সবাই খুব তাড়াহুড়োয় আছে। দ্রুত প্রেম, দ্রুত বিচ্ছেদ, দ্রুত সাফল্য, দ্রুত ক্লান্তি। কখনও কখনও মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কের একটা শেষ দৃশ্য আছে। কোথাও কেউ শেষবারের মতো চা খেয়ে উঠে যাচ্ছে। শেষবার কাপ ধোয়া হচ্ছে। শেষবার কেউ বলছে, “আরেক কাপ হবে?” তারপর একদিন মানুষ থাকে না। শুধু কাপ থেকে যায়। কাপের গায়ে ঠোঁটের ক্ষীণ দাগ থেকে যায়। আলমারির ভেতরে পুরোনো চায়ের গন্ধ থেকে যায়। আর বিকেলবেলা, আলো একটু কমে এলে, হঠাৎ মনে হয়—কেউ যেন এখনও পাশে বসে চা খাচ্ছে। সেই শব্দ শোনা যায় না। তবু বোঝা যায়।

আসলে, শেষ পর্যন্ত বোধহয় মানুষের জীবনে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলো খুব ছোট হয়। “ভালো আছো?”, “কবে ফিরবে?”, কিংবা—“আরেক কাপ হবে কি?” এই প্রশ্নের ভেতরে শুধু চায়ের আমন্ত্রণ থাকে না, থাকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ। একটু আরও বসো। একটু আরও কথা হোক। সন্ধেটা এখনও পুরো ফুরোয়নি। হয়তো পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত এই এক বাক্যেই এসে ঠেকে। কেউ সরাসরি বলতে পারে না, “তুমি চলে গেলে আমার খুব একা লাগবে।”  সেই, সুমন যেরকম গেয়েছিল, “এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই”, তাই মানুষ চুপচাপ কেটলিতে জল চাপায়। কাপ নামায়। ধোঁয়া ওঠে। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করে—“আরেক কাপ হবে কি?” আর সেই মুহূর্তে, পৃথিবীর সমস্ত ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক, সমস্ত হারিয়ে যাওয়া বিকেল, সমস্ত না-বলা ভালোবাসা এক কাপ চায়ের উষ্ণতায় আবার অল্প করে বেঁচে ওঠে।