আপন মহিমা কোথায়
শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন, মান-হুঁশ হও। স্বামীজি বললেন, এসো মানুষ হও। অ-মান-হুঁশ হওয়া বা অমনুষ্যতাই বড় ব্যাধি। শরীরের ব্যাধি হলে শরীর শীর্ণ হয় আর তখন যতই বাহ্যিক সংস্কার করা হোক তাতে স্থায়ী কোন উপকার হয় না। তেমনি মানুষের মন ও চেতনা প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞানের দ্বারা সুসংস্কৃত না হলে বিজ্ঞান প্রযুক্তি সাহিত্য শিল্প কোন কিছুর অগ্রগতিই মানুষের মান বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে না। ভগিনী নিবেদিতা বলেছেন, অন্তরের বিকাশ ছাড়া ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ উপহাসেই পরিণত হয়, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিগত উন্নতি সবই মানুষকে কেন্দ্র করে, মানুষের কল্যাণের জন্যই। কিন্তু মানুষ যদি সেগুলি গ্রহণ করার উপযুক্ত না হয় তাহলে এসবের মূল্য কিছুই থাকে না। তাই আগে মানুষ তৈরি করতে হবে, তবেই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, স্বাধীনতা মানুষের কাজে লাগবে। অন্যথায় এসবের ধ্বংসাত্মক দিকটিই প্রবল হয়ে মানুষের চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে। স্বামীজি মনে করেন, যথার্থ মানুষ তৈরীর কাজে তাঁর কর্মে পরিণত বেদান্ত বা ব্যবহারিক বেদান্তের প্রয়োগ চাই। যার অত্যন্তিক লক্ষ্য হবে এক মানব প্রজাতি, এক দেশ, এক সত্য। আমাদের দর্শন বিজ্ঞান ধর্ম রাজনীতি সমাজনীতি যদি সার্বিক কল্যাণের লক্ষে পরিচালিত না হয়, তবে স্বার্থসংঘর্ষ অনিবার্য এবং বিনাশও অবশম্ভাবী। বর্তমান যুগে আমাদের সমাজ সভ্যতার পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েও আমরা পরস্পরের প্রতি জিঘাংসার মনোভাব ছাড়তে পারছিনা। শুধুমাত্র জড় সভ্যতার বিকাশে যে পরস্পরের প্রতি প্রীতিবৃদ্ধি হয় না, জগতে শান্তি স্থাপিত হয় না সে কথা আজ প্রমাণিত। কেবলমাত্র পার্থিব বস্তুর চাহিদা ও যোগানের দ্বারা স্থূল সুখভোগ, বিলাসিতার প্রতিযোগিতায় মনুষ্যত্বের মান নির্ধারিত হয় না। বরং এগুলিকে কেন্দ্র করে নির্লজ্জ জান্তব প্রতিযোগিতায় মানুষ দীর্ণ হচ্ছে, আপন মহিমাচ্যুত হয়ে ঘৃণিত জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে।

